চেরি ফুলের দেশে

স্বাস্থ্য

[ad_1]

১. এক নজর জাপান

দ্বীপের দেশ জাপান। হোক্কাইডু, হনশু, শিকুকু ও কাইওশো চারটি বৃহৎ দ্বীপসহ জাপানে ছোট-বড় দ্বীপের সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। আয়তন ৩ লাখ ৭৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে লোকসংখ্যা ১২ কোটি ৭১ লাখ (১৯৯২ সালের হিসাবে)। রাজধানী টোকিও। মোট ভূমির ১০ শতাংশে মানুষের বসবাস। চাষাবাদ হয় ১৪ শতাংশে আর ৭০ ভাগ পাহাড় পর্বত বেষ্টিত। উচ্চতম পাহাড়গুলো হনশু দ্বীপে অবস্থিত। জাপান আল্প নামে খ্যাত এসব পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ৭৭৬ মিটার। অধিকাংশ পাহাড়ে আগ্নেয়গিরিময়, গরম বাতাস বইতে থাকে। কোনো কোনো পাহাড়ের পাদদেশের পানি ডিম সিদ্ধ হওয়ার মত গরম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ জাপানবাসীর নিত্যসঙ্গী। ভূমিকম্পের সাথে লড়াই করে বসবাস। বছরে ছোট, বড় ৮ থেকে ৯ হাজার ভূকম্পন হয়ে থাকে। যে কারণে জাপানের বড় বড় ভবনসহ গ্রাম এলাকার বাড়িগুলো বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়ে থাকে। ছোট শহর, শহর সংলগ্ন ও গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি। শহরের বড় ভবনগুলোও ভূকম্পন রোধে বিশেষ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। যাতে করে বড় ভূমিকম্পে বাড়িগুলো ধ্বংস না হয়ে দুলতে থাকে। জাপানি বিভিন্ন দ্বীপে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে সুন্দর হ্রদ সবারই দৃষ্টি কাড়ে। জাপানে পানির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীষ্ম ও শরতে ঝড়, টাইফুন হয় বিভিন্ন দ্বীপে। মাঝে মধ্যে বন্যায় ব্যাপক ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে।

বিচিত্র আবহাওয়ার দেশ জাপানের রাজধানী টোকিওতে যেমন গ্রীষ্মকালে অস্বাভাবিক গরম তেমন শীতকালে তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে। একই ঋতুতে স্থানে স্থানে ভিন্নতর আবহাওয়া বিরাজমান থাকে। চার ঋতুর সে দেশে চেরী ফুল ফোটার মধ্য দিয়ে বসন্তের আগমন ঘটে। জাপানি ভাষায় বসন্তকে বলা হয় ঐধৎঁ. বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয় বসন্তকে। জুনের প্রথম থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত সময় একদিকে গরম অন্যদিকে বর্ষা। এ সময়ে ধানের চাষ হয়ে থাকে। বর্ষার শেষ থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী গ্রীষ্মে হোক্কাইডু ছাড়া সর্বত্র আবহাওয়া গরম। বছরের মধ্যে শরত জাপানিদের জন্য সুন্দর সময়। এ সময় দিন থাকে রৌদ্রোজ্জল। শীতে জাপানের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক তুষারপাত হয়। হোক্কাইডোর সাপোরোসহ বিভিন্ন স্থানে তুষার উৎসব হয়ে থাকে। তুষার দিয়ে ভূত, প্রেতসহ অনেক দর্শনীয় বিভিন্ন জিনিসের প্রদর্শনীর এ উৎসব দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোক এসে জড়ো হয় সাপেরোতে।

লোকসংখ্যার দিক দিয়ে জাপান বিশ্বের ৭ম বৃহৎ দেশ। ভাষা ও সংস্কৃতি মিশ্র। প্রতি কিলোমিটারে ৩৩২ জন লোকের বাস। রাজধানী টোকিওর লোকসংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ। সমুদ্র তীরবর্তী সমতল ভূমিতেই সাধারণত লোকের বাস। শহরগুলোর এমন স্থানেই গড়ে উঠেছে। পাঁচজনের চারজন জাপানিই বাস করে শহরে। বেশির ভাগ পরিবারে এক অথবা দুই সন্তান। বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার প্রায় ভেঙে গেছে। জাপানি নাগরিকদের অনেকে বড় বড় কোম্পানিতে কাজ করে। এসব কোম্পানি সারা বিশ্বেখ্যাত। কোম্পানিতে যারা কাজ করে তারা বেশির ভাগ সময় অফিসেই কাটায়। অনেকে দুই, আড়াইশ’ মাইল দূর থেকে এসেও অফিস করে। বড় বড় কোম্পানি ছাড়াও সরকারি অফিস আদালত, ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা, দোকান, ফার্মে চাকরি এবং নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে থাকে। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে চাকরিতে কোনো তফাৎ নেই, কাজও করে সমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরা বেশি কাজ করে।

সকল জাপানি শিশুর স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক। শিক্ষার হার শতকরা একশ’ ভাগ। পাঁচ স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিন্ডারগার্টেন ৩-৬ বছর, এলিম্যান্টারি ৬-১২ বছর, জিুনিয়র ১২-১৫ বছর, সিনিয়র হাইস্কুল ১৫-১৮ বছর এবং সর্বশেষ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। বৃটিশ ও আমেরিকান শিক্ষা পদ্ধতির মিশ্রণে জাপানি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এখন সকল জাপানি ছাত্রকে ইংরেজি শিখতে হয়। জাপানি বর্ণমালা সংখ্যা ৪৬।

জাপানের সরকার পদ্ধতি গণতান্ত্রিক। সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জাতীয় আঞ্চলিক নির্বাচনে ভোট দানের অধিকারী। ৬টি বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে বড় দল এলডিপি ১৯৫৫ সাল থেকে ক্ষমতাসীন ছিল। পরে জাপানী রাজনীতিতে অনেক উত্থান পতন ঘটে। জাতীয় সংসদ ডায়েট হিসেবে পরিচতি। এর দুটি কক্ষ রয়েছে। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ ও হাউজ অব কাউন্সিল। জাতীয় যেকোনো আইন উভয় কক্ষে পাশ হতে হয়। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যর নির্বাচিত হন স্থানীয়ভাবে। আর হাউজ অব কাউন্সিলররা পুরো জাতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সরকার প্রধান হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ডায়েটের সদস্য এবং ডায়েট কর্তৃক নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীপরিষদ গঠন করে থাকেন। প্রত্যেক মন্ত্রী এক একটা মন্ত্রণালয়ের প্রধান। জাতীয় সরকার সারা দেশের সকল কাজের জন্য দায়ী। ৪৭টা প্রিফেকচার (জেলা)-এর আলাদা আলাদা সরকার আছে। প্রিফেকচারের অধীনে প্রতি শহর ও গ্রামে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার দ্বারা পরিচালিত। প্রতিটি স্থানীয় সরকার তাদের নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।

গণতন্ত্রের সাথে রাজতন্ত্রের সহবস্থান রয়েছে জাপানে। অথার্ৎ রাজতন্ত্র এখনও বহাল। জাপানের সংবিধান মতে সম্রাট হচ্ছেন রাষ্ট্র ও জনগণের ঐক্যের প্রতীক। তবে সরকার পরিচালনার ব্যাপারে তাঁর কোনো হাত নেই। বর্তমান সম্রাট আকিহিতো। ১৯৮৯ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মিচিকোর তিন সন্তান। সম্রাট পরিবার রাজধানী টোকিও-এর ইমপেরিয়াল প্যালেসে বসবাস করেন। ৭১০ সালে নারা ছিল জাপানের রাজধানী। ৭৯৪ সালে কিওটো-তে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। অনেক শতাব্দী ধরে কিওটো রাজধানী থাকাকালে আধুনিক সুন্দর ও অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য কলার ভবন, মন্দির, প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। যেগুলো এখনও আছে। ১৮৬৮ সালে কিওটো থেকে পূর্ব জাপানের ইডোতে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। পরে নাম পরিবর্তন করে টোকিও করা হয়। যার অর্থ “পূর্ব রাজধানী”।

ভাত, মাছ, মুরগীসহ বিভিন্ন ধরনের মাংস, শাকসবজি ও নুডলস্ জাপানিরা খেয়ে থাকেন। তবে প্রস্তুত প্রণালী তাদের নিজস্ব স্টাইলে। খাবারের সাথে স্যুাপ থাকবেই। এছাড়া থাকে সস্। প্রস্তুত প্রণালীর মধ্যে কোনো কোনো খাবার একদম বলতে গেলে কাঁচাই থাকে। প্রতি বেলা খাবারের সাথে ফল থাকে। সব শেষে গ্রীন টি পান করা জাপানিদের ঐতিহ্য। জাপানি তরুণ-তরুণীদের কাছে চাইনিজ খাবার খুবই প্রিয়। জাপানের বিভিন্ন শহরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের খাবারের হোটেল আছে। জাপানিদের প্রিয় খেলার মধ্যে আছে সুমো, জুডো, কারাতে এবং কেল্ডো। সুমো খেলা খুবই জনপ্রিয়। দু’জন অস্বাভাবিক মোটা ও দীর্ঘদেহী ব্যাক্তির মধ্যে কুস্তি প্রতিযোগিতাকেই সুমো বলা হয়। সুমো খেলোয়ড়রা জাপানে অনেক জনপ্রিয়। তারকা খ্যাতি রয়েছে তাঁদের। আধুনিক খেলা হিসাবে বেইসবল, বাস্কেট বল, টেনিস ও ভলিবল বেশ জনপ্রিয়।

চা উৎসব জাপানিদের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। অতিথিদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে অতিথি ও আমন্ত্রণকারীর বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে চা তৈরি ও পরিবেশ করা হয়। ১৫ শতক থেকে জাপানে উদযাপিত হয়ে আসছে চা উৎসব। এ জন্য বাড়ির সাথেই থাকে ছোট্ট একটি ঘর। আবার কেউ কেউ বাগানে উৎসবের আয়োজন করে। চা উৎসবে বিশেষ সাজসজ্জা যেমন থাকে তেমনি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়। ফুল জাপানিদের কাছে খুবই প্রিয়। কোনো বাড়িতে সামান্য খালি জায়গা থাকলেই ফুলের বাগান করা হয়। ঘরে ঘরে শোভা পায় তাজা ফুল। ফুল দিয়ে ঘর সাজানো এবং বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করতে জাপানিদের জুড়ি নেই। জাপানি ভাষায় ফুল সাজানোকে বলা হয় ইকেবানা। আনুষ্ঠানিক পোশাক হচ্ছে কিমোনো। বিবাহ, জন্মদিন, মৃত্যুসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবে বিভিন্ন ডিজাইনের কিমোনো পরে জাপানীরা। বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া অন্য সকল সময়ে পাশ্চাত্যের আধুনিক পোশাক এখন সারা জাপানে চালু।

প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকাংশই জাপানে আমদানি করা হয়। তার মধ্যে জ্বালানি তেল অন্যতম। ১৯৯০ সালে জাপানে ২১৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের দ্রব্য সামগ্রী আমদানি করা হয়। আর রপ্তাানি করে ২৮০ বিলিয়ন ডলার। কৃষি ও মৎস্য চাষ জাপানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গাড়ি উৎপাদনের জাপান শ্রেষ্ঠ। আধুনিক গাড়ি তৈরিতে তাদের সুনাম আছে। ১৯৯০ সালে জাপানে ১ কোটি ৩৫ লাখ গাড়ি উৎপাদিত হয়। গাড়ি উৎপাদন কারখানাগুলোতে রোবট মুখ্য ভূমিকা পাল করে। জাপানে আরেকটি বড় শিল্প হচ্ছে ইলেকট্রোনিকস্। অর্থনীতিতে এসব সামগ্রীর অবদান বিরাট। সব ধরনের যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জাপানে রয়েছে। বাস, ট্রেন, স্টিমার, বিমান, বাইসাইকেল থেকে শুরু করে বিশ্বের দ্রুতগামী বিমান পর্যন্ত চালনা করে। তবে যোগাযোগে রেলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাটির নীচ দিয়ে প্রতিটি শহরেই রয়েছে ট্রেন সার্ভিস। শিনকানসেন যা বুলেট ট্রেন নামে পরিচিত জাপান সহ বিশ্বের দ্রুততম ট্রেন। বড় বড় শহরের মধ্যে এ ট্রেনে রাজধানীর সাথে যোগাযোগ রয়েছে। নদীপথে ৪টি প্রধান দ্বীপের সাথে নদীপথে যেমন যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছে তেমনি স্থলপথেও সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। জাপানীদের মতে হনশু ও শিকুকু দ্বীপের মধ্যে বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু নির্মিত হয়েছে।

জাপানে মূলত দুটি ধর্ম প্রচলিত। একটা আদি ও নিজস্ব ধর্ম শিন্টু, অপরটি বৌদ্ধ। উৎসবের মধ্যে ইংরেজি নববর্ষের উৎসব প্রধান। ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে ১লা থেকে ৩রা জানুয়ারি পর্যন্ত তিনদিন ব্যবসা, বাণিজ্য, দোকানপার্ট বন্ধ থাকে। আত্মীয়-স্বজন একত্রে মিলিত হয়। শহর থেকে নাগরিকরা দল বেঁধে গ্রামে যায়। আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে ৩১শে ডিসেম্বর পালন করে। একগুয়ে নাগরিক জীবন থেকে মুক্তি পেতেই গ্রামে যেয়ে মেতে উঠে উৎসবে। জাপানে খাবারের মধ্যে নুডলস্ অন্যতম। আবার নুডলস্ জাপানীদের জন্য দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। অন্যান্য উৎসবের মধ্যে আছে মধ্য আগস্টের ‘ও বন’ (বৌদ্ধ) উৎসব, মার্চে পুতুল উৎসব, মে’তে শিশু দিবস, জুলাইয়ে স্টার উৎসব, নভেম্বরে স্বাস্থ্য উৎসব। চলবে…

বাংলাদেশ জার্নাল/আর



[ad_2]

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *